তালাক দেয়ার মাসায়েল

১। নিতান্ত অপারগতা ছাড়া তালাক দেয়া জুলুম ও অন্যায় ।
২। নিতান্ত ঠেকা ব্যতীত স্বামীর নিকট তালাক চাওয়া মহাপাপ ।
৩। কোন কল্যাণ ও প্রয়োজনে তালাক দেয়া মোবাহ বা জায়েয ।
৪। স্ত্রী যদি স্বামীর জন্য কষ্টদায়ক হয় বা স্ত্রী নামায সম্পূর্ণ পরিত্যাগ-কারিণী হয় বা স্বামীর অবাধ্য হয়, তাহলে সে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়া মোস্তাহাব বা উত্তম । বোঝানো সত্ত্বেও যে স্ত্রী অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয় তাকেও তালাক দিয়ে দেয়া মোস্তাহাব ।
৫। স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর হক আদায় করতে অক্ষমতা দেখা দিলে তালাক দেয়া ওয়াজিব। তবে স্ত্রী তার হক মাফ করে দিলে ওয়াজীব থাকে না ।
৬। নিজের কানে শোনা যায়- এতটুকু শব্দে তালাক দিলেই তাকাল হয়ে যায়, স্ত্রীর বা অন্য কারও শোনা যাওয়া জরুরি নয় ।
৭। হাসি-ঠাট্রা করে বা রাগের মুহূর্তে বা নেশা করে মাতাল হয়ে, ঐ অবস্থায় তালাক দিলেও তালাক হয়ে যায় ।
৮। তালাক দেয়ার ক্ষমতা স্বামী ব্যাতীত অন্য কারও নেই । অবশ্য স্বামী কাউকে তালাক দেয়ার ক্ষমতা দিলে সে তালাক দিতে পারে ।
৯। হায়েয নেফাসের অবস্থায় তালাক দিলে তালাক হয়ে যায় । তবে হায়েয নেফাসের অবস্থায় তালাক দেয়া গোনাহ ।
১০। একসঙ্গে তিন তালাক দেয়া হারাম ও গোনাহে কবীরা । তবে একসঙ্গে তিন তালাক দিলেও তিন তালাক হয়ে যাবে এবং স্ত্রী তার জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যাবে । এমতাবস্থায় নিয়ম মাফিক অন্য স্বামীর ঘর হয়ে ঘুরে না আসলে আর তাকে স্ত্রী হিসেবে রাখার বা বিয়ে করার উপায় থাকবে না ।
১১। কারও চাপ, জোর-জবরদস্তী বা হুমকির মুখে তালাক দিলেও তালাক হয়ে যাবে।
 বিঃ দ্রঃ তালাকের বিভিন্ন শব্দ এবং তালাকের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে । তালাকের শব্দ অ প্রকারের পার্থক্যের ভিত্তিতে হুকুমেরও পার্থক্য হয়ে থাকে । তাই তালাক সম্পর্কিত কোনো ঘটনা ঘটলে মুফতীদের থেকে সমাধান জেনে নিতে হবে ।
তালাক দেয়ার তরীকাঃ 
তালাক দেয়ার তিনটি তরীকা বা পন্থা রয়েছে । যথা- (১) অতি উত্তম, (২) উত্তম এবং (৩) বিদআত ও হারাম । এই তিনটি তরিকা সম্বন্ধে বিবরন দেয়া হলো ।
১। তালাক দেয়ার অতি উত্তম তরীকা হল- স্ত্রী যখন হায়েয থেকে পাক হবে তখন (অর্থাৎ, তহুর বা পাকীর সময়ে) এক তালাক দিবে এবং শর্ত এই যে, এ তহুরের মধ্যে তার সাথে সহবাস হতে পারবে না । এর পরবর্তী হায়েয থেকে তার ইদ্দাত শুরু হবে এবং তিন হায়েয অতিবাহিত হলে তার ইদ্দত শেষ হবে । এই ইদ্দতের মধ্যে আর কোনো তালাক দিবে না । ইদ্দাত শেষ হলে বিয়ে ভেঙ্গে যাবে ।
২। তালাক দেয়ার উত্তম তরীকা হল- স্ত্রী হায়েয থেকে পাক হলে তহুরের মধ্যে এক তালাক দিবে । তারপর তৃতীয় হায়েয গিয়ে দ্বিতীয় তহুর এলে তাতে আর এক তালাক দিবে । তারপর তৃতীয় অহুরে আর এক তালাক দিবে । এভাবে তিন তহুরে তিন তালাক দিবে এবং ঐ সময়ের মধ্যে ঐ স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে না।
৩। তালাকের বিদআত ও হারাম তরীকা হল- উপরোক্ত তরীকাদ্বয়ের বিপরীত নিয়মে তালাকে দেয়া। যেমনঃ একসঙ্গে তিন তালাক দেয়া বা হায়েযের সময় তালাক দেয়া বা যে তহুরে সহবাস হয়েছে সেই তহুরে তালাক দেয়া। এসব অবস্থায় তালাক দিলে তালাক হয়ে যায়, তবে গোনাহ হয়। অতএব তা থেকে বিরত থাকা উচিত।

ইদ্দতের মাসায়েলঃ
(স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা হলে বা তার স্বামীর মৃত্যু হলে যে সময়ের জন্য উক্ত স্ত্রীকে এক বাড়ীতে থাকতে হয়, অন্যত্র যেতে পারে না বা অন্য কোথাও বিয়ে বসতে পাবে না, তাকে ইদ্দত বলে । ইদ্দতের মাসায়েল নিম্নরূপ।)
* স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হলে তালাকের তারিখের পর পূর্ণ তিন হায়েয অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত স্ত্রীর পক্ষে অন্য কোথাও বিয়ে বসা হারাম।
* উক্ত ইদ্দতের সময়ে তাকে স্বামীর বাড়ীতেই নির্জন বাসস্থানে থাকতে হবে ।
* উক্ত স্ত্রী বয়স কম হওয়ার কারণে বা বৃদ্ধ হওয়ার কারণে হায়েয না আসলে তিন হায়েযের পরিবর্তে পূর্ণ তিন মাস উপরোক্ত  নিয়মে ইদ্দত পালন করতে হবে ।
* গর্ভাবস্থায় তালাক হলে সন্তান প্রসব হওয়া মাত্রই ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে, চাই যত তাড়াতাড়ি প্রসব হোক কেন ।
* হায়েযের অবস্থায় তালাক হলে সে হায়েযকে ইদ্দতের মধ্যে ধরা যাবে না। সে হায়েয বাদ দিয়ে পরবর্তী পূর্ণ তিন হায়েয ইদ্দত পালন করতে হবে ।
* যদি কোন স্ত্রীর সাথে স্বামীর সহবাস বা নির্জনবাস হওয়ার পূর্বেই স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয় তাহলে তাকে ইদ্দত পালন করতে হয় না ।
* কোনো বিয়ে যদি অবৈধ হয় এবং সহবাসও হয়, তাহলে ঐ পুরুষ যখন তাকে পরিত্যাগ করবে তখন থেকে ইদ্দত পালন করতে হবে ।
* যে স্ত্রীর স্বামী মারা যায় তার ইদ্দত হল চার মাস দশ দিন আর গর্ভবতী হলে তার ইদ্দত সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত ।
* স্বামীর মৃত্যু চাদের প্রথম তারিখে হলে চাদের হিসাবে চার মাস দশ দিন ধরা হবে। আর চাদের প্রথম তারিখ ছাড়া অন্য যেকোনো তারিখে মৃত্যু হলে ৩০ দিনের চার মাস এবং তারপর ১০ দিন অর্থাৎ, ১৩০ দিন ইদ্দত পালন করবে। স্ত্রী ঋতুবতী বা গর্ভবতী না হলে যদি তাকে তালাক দেয়া হয়, তাহলে চাদের ১ম তারিখে তালাক হলে চাদের হসাবে তিন মাস আর আন্য তারিখে তালাক হলে ৩০ দিনের মাস অর্থাৎ, ৯০ দিন ইদ্দত ধরা হবে ।
* স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী ইদ্দত পালন করবে । তার গর্ভ থাকলে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত, অন্যথায় চার মাস দশ দিন পর্যন্ত এই ইদ্দত পালন করবে । এ সময়ে সে সাজ-সজ্জা এবং রূপ চর্চা থেকে বিরত থেকে শোক পালন করবে। স্বামীর মৃত্যুর সময় সে যে ঘরে বসবাস করত সেখানেই থাকবে, সেখান থেকে বের হবে না । ভাড়ার বাসা হলে ভাড়া দেয়ার ক্ষমতা থাকলে সেখানেই থাকবে । তবে নিরাপত্তার অভাব হলে নিকটতম স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে ইদ্দত পালন করবে। এ সময়ের মধ্যে সে কারও সঙ্গে বিবাহ বসতে পারবে না । 
আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ)

এই হাদিস টিঃ আহকামে যিন্দেগী বই থেকে নেয়া । 
পেজ নং : ৪২৩ -৪২৬।

0 comments: