বিবাহ পার্ট ২

মহর সম্পর্কিত মাসায়েল ঃ  
* মহর পরিশোধ করা ওয়াজিব । তাই নাম শোহরতের জন্য সাধ্যের অতিরিক্ত মহর ধার্য করা অপছন্দীয় । 
* রাসূল (সা:) তার কন্যা ফাতেমার জন্য যে মহর ধার্য করেছিলেন , তাকে "মোহরে ফাতিমী" বলা হয়।  বর্তমানের হিসেবে তার পরিমান কি, এ ব্যাপারে তিনটি উক্তি পাওয়া যায় (১) ১৩১¼ তোলা রূপার সমপরিমাণ (২) ১৪৫¾ তোলা রত্তি রূপার সমপরিমাণ। (৩) ১৫০ তোলা রূপার সমপরিমাণ সতর্কতা স্বরূপ ১৫০ তোলার মতটি গ্রহণ করা যায়। বর্তমানে প্রচলিত গ্রাম-এর ওজন  হিসেবে ১৫০ তোলা= ১৭৪৯,৬০০ গ্রাম। খুচরা বাকীটুকু পূর্ণ করে দিয়ে ১৭৫০ গ্রাম ধরা চলে। 
* কমের পক্ষে মহরের পরিমান দশ দেরহাম (অর্থাৎ, প্রায় পৌণে তিন তোলা রূপার সমপরিমাণ ) এর বেশি যতো দিতে পারো এর কোন সীমা নেই। তবে খুব বেশি মহর ধার্য করা ভাল নয়।  
* বিবাহের সময় মহর ধার্য হলে এবং বাসর ঘর অতিবাহিত হলে ধার্যকৃত পূর্ণ মহর দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়।  আর বাসর ঘর হওয়ার পূর্বে তালাক হলে ধার্যকৃত মহরের অর্ধেক দেয়া ওয়াজিব হয়।  
* বিবাহের সময় মহরের উল্লেখ না হলে 'মহরে মেছেল' ওয়াজিব হয় আর এরূপ ছুড়তে বাসর ঘর হওয়ার পূর্বেই তালাক হয়ে গেলে সে মেয়েলোকটি মহর পাবে না- শুধু একজোড়া কাপড় পাবে।  একজোড়া কাপড়ের অর্থ লম্বা হাত ওয়ালা একটা জামা , একটি উড়না বা ছোট চাদর ও একটি পায়জামা। অথবা একটা শাড়ি ও একটা বড় চাদর যার দ্বারা আপাদ মস্তক ঢাকা যায়।  
* "মহরে মেছেল" বা খান্দানি মহর বিবেচনার ক্ষেত্রে বাপ দাদার বংশের মেয়েদের যেমন বোন, ফুফু, ভাতিজী, চাচাত বোন প্রমুখের মহর দেখতে হবে। এবং এই খান্দানি মহর নিরূপনের ক্ষেত্রে যুগের পরিবর্তনে, স্থানের পরিবর্তনে, রূপগুন, বয়স, পাত্র, দ্বিতীয় এবং বিবাহের তারতম্যে মহরের যে তারতম্য হয়ে থাকে তও বিবেচনায় আনতে হবে।  
* স্বামীর যদি মহরের নিয়তে (খোরাক, পোশাক ও বাসস্থান ব্যতিরেকে ) কিছু টাকা বা অন্য কোন মাল জিনিস দেয়, তাহলে তার মহর থেকেই কাটা যাবে।  
* স্বামী যদি স্ত্রীকে ধমক দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে বা লজ্জায় ফেলে বা অন্য কৌশলে ও অসুদপায়ে স্ত্রীর আন্তরিক ইচ্ছা না থাকা সত্বেও তার দ্বারা মহর মাফ করিয়ে নেয় তবে তাতে মহর মাফ হয়ে যায় না।

ওলীর বর্ণনা ঃ 
* ছেলে/মেয়েকে যে বিবাহ দেয়ার ক্ষমতা রাখে তাকে ওলী বলে। ওলীর জন্য আকেল বালেগ এবং মুসলমান হওয়া শর্ত।  
* ছেলে/মেয়ের সর্বপ্রথম ওলী তাদের পিতা, পিতা না থাকলে দাদা, তারপর পরদাদা, তাদের কেউ না থাকলে আপন ভাই  তারপর বৈমাত্রেয় ভাই, তারপর আপন ভাইয়ের ঘরের ভাতিজা তারপর বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ঘরের ভাতিজা (উপরোক্ত তারতীব অনুযায়ী) যদি কোন পুরুষ ওলীগণ না থাকে তাহলে মা ওলী হবে। তারপর দাদি, তারপর নানী , তারপর নানা , তারপর আপন বোন, তারপর বৈমাত্রেয় বোন , তারপর বৈপিত্রেয় ভাই-বোন , তারপর ফুফু, তারপর মামা, তারপর চাচাত বোন।
* এক শ্রেণীর কয়েকজন ওলী থাকলে বড় জন অন্যদের সাথে পরামর্শ ক্রমে কাজ করবে।  বড় জনের অনুমতি নিয়ে অন্যরাও কাজ করতে পারে।  
* মেয়ে বালেগা হলে ওলীর বিনা অনুমতিতে সে সমান ঘরে বিবাহ বসতে পারে , কিন্তু সমান ঘরে বিবাহ না বসে নিচ ঘরে বিবাহ বসলে এবং ওলী তাতে মত না দিলে সে বিবাহ দুরস্ত হবে না।  

এযেন নেয়ার তরীকা ও মাসায়েল ঃ 
* মেয়ে যদি ছেলেকে পূর্বে থেকে না চিনে তাহলে এযেন (অনুমতি /সম্মতি ) নেয়ার সময় মেয়ের সামনে ছেলের নাম-ধাম, পরিচয় ও মহরের কথা তুলে ধরে বলতে হবে "আমি তোমাকে বিবাহ দিচ্ছি বা বিবাহ দিলাম বা বিবাহ দিয়েছি।  তুমি রাজি আছ্ কি না? 
* সাবালেগা অবিবাহিত মেয়ের নিকট এযেন চাওয়ার পর সে (অসম্মতিসূচক কোন ভাব প্রকাশ না করে সম্মতি সূচক ভাব প্রকাশ করে অর্থাৎ, গম্ভীর ভাব ধারণ করে ) চুপ থাকলে বা মুচকি হেসে দিলে বা (মা বাপের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মন বেদনায়) চোখের পানি ছেড়ে দিলে তার এযেন আছে ধরা হবে।  জবরদস্তি তার মুখ থেকে "রাজি আছি" কথা বের করার চেষ্টা নিষ্প্রয়োজন ও অন্যায়।  
* মেয়ে পূর্বে থেকে ছেলেকে না চিনলে এবং তার সামনে ছেলের নাম/ধাম, পরিচয় সুস্পষ্টভাবে তুলে না ধরলে তার চুপ থাকাকে এযেন বা সম্মতি ধরা যাবে না।  
* শরীয়ত অনুসারে যে ওলীর হক অগ্রগণ্য, তিনি বা তার প্রেরিত লোক ব্যতীত অন্য কেউ এযেন আনতে গেলেও সে ক্ষেত্রে মেয়ের চুপ থাকাটা এযেন বলে গণ্য হবে না বরং সে ক্ষেত্রে স্পষ্ট অনুমতির শব্দ উল্লেখ করলেই এযেন ধরা যাবে।  
* যদি মেয়ে বিধবা কিন্বা তালাক প্রাপ্ত হয় তাহলে তার চুপ থাকাটা এযেন বলে গণ্য হবে না বরং মুখ দিয়ে স্পষ্ট কথা (যেমন "রাজি আছি") বলতে হবে। 

বিবাহ মজলিসের কয়েকটি  রছম ও কুপ্রথা ঃ 
* বিবাহের গেটে টাকা ধরা না জায়েয। 
* বিবাহের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর বর দাঁড়িয়ে হাজিরীন মজলিসকে যে সালাম দিয়ে থাকে, এটা একটা  রছম- এটা পরিত্যাজ্য।  
* বিবাহের পর বর গুরুজনদের সাথে যে মুসাফাহা করে থাকে এটা ভিত্তিহীন  ও বেদআত।  
* বিবাহের পর বধূর মুখ দেখানো রছম ও (পর পুরুষকে দেখানো ) না জায়েয। 

বাসর রাতের কতিপয় বিধান ঃ
* নববধূ মেহেদী ব্যবহার করবে , অলংকার এবং উত্তম পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত হবে।  
* পুরুষ বাসর ঘরে প্রবেশ করত: নববধূকে সহ দুই রাকআত (শুকরানা) নামায পড়বে। 
অতঃপর স্ত্রীর কপালের উপরিস্থিত চুল ধরে বিসমিল্লাহ বলে দুআ পাঠ করা সুন্নাত-
ওলীমা বিষয়ক সুন্নাত ও নিয়ম সমূহ ঃ
* বাসর ঘর হওয়ার পর (তিন দিনের মধ্যে বা আকদের সময়) আপন বন্দু-বান্দব , আত্মীয়-স্বজন এবং গরীব মিসকীনদেরকে ওলীমা অর্থাৎ, বৌ-ভাত খাওয়ানো সুন্নাত।  কেউ কেউ বাসর হওয়ার পর এবং একদের সময় উত্তম সময়েই এরূপ আপ্যায়ন উত্তম বলেছেন।  
* ওলীমায় অতিরিক্ত ব্যয় করা কিংবা খুব উঁচু মানের খানার ব্যবস্থা করা জরুরি নয় বরং প্রত্যেকের সামর্থানুযায়ী খরচ করাই সুন্নাত আদায়ের জন্য যথেষ্ট।  
* যে ওলীমায় শুধু ধনী ও দুনিয়াদার লোকদের দাওয়াত করা হয় এবং দ্বীনদার ও গরীব মিসকিনদের দাওয়াত করা হয় না হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী তা  হল সর্ব নিকৃষ্ট ওলীমা, অতএব  ওলীমায় দ্বীনদার ও গরিব মিসকীনদেরকেও  দাওয়াত করা উচিত।  
* আমাদের দেশে যে বরযাত্রী যাওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে এবং কনের পরিবারের পক্ষ থেকে ভোজের ব্যবস্থা করার নিয়ম চালু হয়েছে, এটা শরীয়ত সম্মত অনুষ্ঠান নয়- এটা রছম, অতএব তা পরিত্যজ্য।

(বিবাহ সম্পর্কে সব মাসায়েলা শেষ এখন "তালাক" সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো পরের আর্টিকেলে, আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।)

0 comments: